ছোট পুকুরে বা জলাশয়ে গলদা চিংড়ি চাষ করার সহজ উপায়

আপনার বাড়ির আশে পাশে যদি থাকে ছোট পুকুর বা জলাশয় তাহলে আপনি লাভজনক গলদা চিংড়ি চাষ করতে পারেন। চিংড়িকে বলা হয় সাদা সোনা কারন অনেক দামি প্রজাতির এই গলদা চিংড়ি মাছ। চিংড়ি মাছের রয়েছে বহু প্রজাতি এবং এটি দশ পদ বিশিষ্ট প্রাণী। বর্তামানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের লোক স্বাদু পানির মাছ হিসেবে গলদা চিংড়ি কে সবাই কম বেশি পরিচিত। আমাদের দেশে এটি খুবেই জনপ্রিয় মাছ। আসুন আজ গলদা চিংড়ি মাছ চাষ করার সকল আইডিয়া দেখে নিবো।

গলদা চিংড়ি চাষের পুকুর তৈরি

আপনি গলদা চিংড়ি চাষের জন্য আপনার বাড়ীর পাশের ছোট কিংবা মাঝারি সাইজের পুকুর নির্বিচন করতে পারেন। আবার কোন ছোট বা মাঝারি রকম জলাশয় নির্বাচন করতে পারেন। তবে সর্বদা লক্ষ রাখবেন যেন পুকুরের পাড় যেন সর্বদা মজবুত থাকে এবং বন্যা মুক্ত থাকে। আপনি এবার পুকিরের আগাছা নির্মুল করুন আর সূর্যের আলো যেন সর্বদা পুকুরে থাকে এই বিষয়ে ভাল খেয়াল রাখতে হবে।

গলদা চিংড়ি চাষে অন্য মাছ নিধন

আপনার ছোট বা বড় পুকুরে অবশ্যই অন্য কোন মাছ রা রাক্ষুসে মাছ অবশ্যই রয়েছে। সেগুলু আপনি নিধন করুন। রাক্ষুসে মাছের মধ্যে অন্যতম মাছ হচ্ছে: শোল, টাকি, বোয়াল, মাগুর, গজার ইত্যাদি। এসব মাছের প্রিয় খাদ্য চিংড়ি মাছ। তাই আপনি এসব মাছ আগেই রাসায়নিক ঔষধ প্রয়োগ করে নিধন করে নিন। পারলে পুকুরের পানি সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলুন।

গলদা চিংড়ির রেণু সংগ্রহ

আপনি গলদা চিংড়ির রেনু সংগ্রহ করতে পারেন স্থানীয় কোন হ্যাচারি থেকে। আপনি যখন হ্যাচারি থেকে চারা সংগ্রহ করবেন তখন আপনি অবশ্যই নতুন গলদা চিংড়ির ভার্সন নিবেন। এছাড়াও আপনি প্রকৃতিক উপায়ে যেমন: নদী, বাওর, সমুদ্র থেকে গলদা চিংড়ি আহরন করতে পারেন। তবে সমস্যা হবে তখন আপনি মিশ্র চিংড়ি চাষ হিসেবে করতে হবে। তাই আপনি কোন নার্সারি থেকে চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করুন।

গলদা চিংড়ি চাষের সময়

গলদা চিংড়ি বাংলাদেশে ১২ মাসেই চাষ করা যায়। তবে বছরে দুই সময়ে রণু ছাড়া সব থেকে ভাল উত্তম হয়।
• মার্চ- এপ্রিল মাস।
• সেপ্টেম্বর – অক্টবর মাস।
আপনি যদি এই দুই সময়ে গলদা চিংড়ির রেণু চাষ শুরু করেন তাহলে ভাল ফল পেয়ে যাবেন। এছাড়া আপনি যখন চিংড়ি চাষের জন্য পুকুরে রেণু ছাড়বেন তখন অবশ্যই ভোরে কিংবা সন্ধায় ছাড়া উত্তম। তার কারন হল এই সময়ে পানির আদ্রতা ও তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকে এতে সহজেই রেণু পোনার সাথে মানিয়ে উঠে।

গলদা চিংড়ি ছাড়ার কৌশল

আপনি যখন গলদা চিংড়ি পুকুরে ছাড়বেন তখন অবশ্যই খুবেই সাবধানতায় ছাড়বেন। কারন গলদা চিংড়ি স্বাদু পানি ও কিছুটা লবানক্ত পানির মাছ। তাই আপনাকে সঠিক পদ্ধতি নিয়ে রেণু ছাড়তে হবে। আপনি সকালে কিংবা সন্ধায় এই পোনা ছাড়বেন। আপনি যখন নার্সারি থেকে রেণু পোনা সংগ্রহ করবেন তখন অবশ্যই অক্সিজেন করে পলি ব্যাগে রেণু নিয়ে আসবেন। এরপর আপনি সেই পলিব্যগ পুকুরের পানির উপরে রাখুন। যখন পুকুরের পানির তাপমাত্রা ও অক্সিজেন ব্যাগের তাপমাত্রা সমান হবে তখন আস্তে আস্তে পলির মুখ খুলে দিন। এরপর পুকুরে পানি পলিব্যগে অল্প অল্প করে প্রবেশ করিয়ে নিন। এভাবে ৪০ থেকে ৬০ মিনিট রাখুন। যখন দেখবেন রেণু সব ঠিক আছে তখন অল্প অল্প করে ব্যাগের পানি পুকুরে ফেলে দিন।

গলদা চিংড়ির খাবার

গলদা চিংড়ি চাষ করতে গেলে চিংড়ি মাছের জন্য উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত রকম খাবার প্রদান করতে হবে। চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের পাশাপাশি উপযুক্ত খাবার না পেলে সেই চাষ হুমকির মুখে চলে যাবে। চিংড়ির স্বাভাবিক ভাবে প্রকৃতিক খাদ্য খেয়ে থাকে তারমধ্যে শেওলা অন্যতম এছাড়াও আপনি নিয়মিত গলদা চিংড়ির খাবার হিসেবে এসব রাখুন

• শামুক।
• ঝিনুক।
• কাঁকড়া।
• স্কুইড।
• মাংস।
আর দানাদার খাদ্যও গলদা চিংড়ির জন্য উত্তম। আপনি দানাদার খাদ্যের তালিকায় রাখতে পারেন

• চাল।
• ডাল।
• গম।
• ভূট্টা।
এছাড়াও চিংড়ি জৈব সার খেতে পছন্দ করে তার মধ্যে পচনশীল জৈব খাদ্য, প্রাণী উদ্ভিদকণা খেয়ে বেচে থাকতে পারে।

গলদা চিংড়ি মাছের যত্ন

শুধু নিয়মিত খাদ্য প্রদান করলে হবে না। গলদা চিংড়ি চাষ করতে হলে নিয়মতি যত্ন নিতে হবে । আপনি পুকুরের চারপাশ ভালভাবে জাল দিয়ে ঘিরে রাখুন। এতেকরে আপনার চিংড়ি নিরাপদে থাকবে। তাছাড়া সাপ, ব্যাঙ, কুঁচে, কাঁকড়া পুকুরে প্রবেশ করে চারা সহ চিংড়ি খেয়ে ফেলতে পারে।

গলদা চিংড়ি যখন বড় হতে শুরু করে দেয় তখন তারা তাদের খোলোস পাল্টায়। খোলস সঠিকভাবে পাল্টানোর জন্য আপনাকে সুন্দর করে, বাঁশ, কঞ্চি দিয়ে পুকুরে ছাওনি দিয়ে রাখুন। এতে করে চিংড়ির খোলস পাল্টানোর সুবিধা হবে। আবার চিংড়ি কিন্তুু স্ব-জাতী প্রাণী। যখন চিংড়ির খোলস পাল্টাতে থাকে তখন তাদের গা খুব নরম থাকে সেই সুযোগে অপর চিংড়ি নরম চিংড়িকে খেয়ে ফেলে। এটা প্রকৃতিক তাই এটা বন্ধ করতে পারবেন না।

গলদা চিংড়ির রোগ

গলদা চিংড়ির রোগ সব থেকে বেশি হয় যখন আপনার পুকুরে বিষাক্ত গ্যাস এর কারনে পুকুরের পানির পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। এরফলে চিংড়ি মারাও যেতে পারে। এছাড়াও আর অনেক ধরনের গলদা চিংড়ির রোগ দেখা দেয় তার মধ্যে অন্যতম হল : মাথায় ক্রিমি হওয়া, মাথায় পানি জমে যাওয়া, চিংড়ির গায়ে শ্যাওলা হওয়া, লেজ পচা, এন্টেনা ভেঙ্গে যাওয়া ও কাটা। এসব রোগের দ্রুত চিকিৎসা নিলে এসব রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। চিংড়ির জীবন চক্রে এক বা একের অধিক অস্বাভাবিক অবস্থা ও চিংড়ির স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে অবস্থাভেদে চিংড়ি মারা যেতে পারে। আপনি নিয়মিত পুকুরে বা জলাশয়ে সার প্রয়োগ করুন আশাকরি সব কিছু ঠিক থাকবে।

চিংড়ি মাছ আহরণ

চিংড়ি মাছ আহরেনের কোন সময় নেই। পরিপক্ক চিংড়ি হলেই আপনি পুকুর থেকে চিংড়ি আহরন করতে পারেন। আপনার সেই ছোট পুকুর বা জলাশয় থেকে বেশ কিছু চিংড়ি মাছ উৎপাদন করতে পারবেন। যদি আপনি ঠিক মত সব কিছু করে থাকেন। আপনার পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আপনি বাজারে চিংড়ি মাছ বিক্রি করে আয় করতে পারেন। ছোট পুকুর থেকে বেশ ধারনা নিয়ে আপনি বড় করে চিংড়ি মাছে খামার দিয়ে বানিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ করতে পারোন।

চিংড়ি মাছের পূষ্টিগুণ

চিংড়ি মাছে যত টেষ্টিকর খাবার ঠিক রয়েছে অনেক রকম পুষ্টিগুন। যা মানুষের শরীরে পুষ্টির চাহিদা পূরন করে থাকে। চিংড়ি মাছের পূষ্টির মধ্যে রয়েছে- প্রোটিন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, ভিটামিন বি-১২ আয়রন।

পোস্টটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Comment