ট্রেডমার্ক কি ও ট্রেডমার্কস আবেদন করুন খুব সহজেই

আজকে আমি এমন একটি বিষয় নিয়ে লিখব যেটা প্রত্যেক ব্যবসায়িকের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হল ট্রেডমার্ক ও ট্রেডমার্কস আবেদন করার সহজ পদ্ধতি। আপনি এই পোস্ট সুন্দর করে মনোযোগ সহকারে পড়ুন যাতে করে ট্রেডমার্ক সমন্ধে বিস্তারিত জানতে পারেন ও আপনার ব্যবসার জন্য খুব সহজেই ট্রেডমার্ক লাইসেন্স নিতে পারেন। কথা না বাড়িয়ে চলুন বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক।

ট্রেডমার্ক কি

প্রথমে মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে ট্রেডমার্ক কি কারন অনেকেই হয়তো এটা নিয়ে প্রথম জানলেন। আসলে ট্রেডমার্ক এমন একটি ছাড়পত্র ( প্রতীক) যেটি আপনার ব্যবসার লোগো, পণ্যের লোগো ও সেবার লোগো। যেটা একটি উৎসের লোগো থেকে আর একটি উৎসের লোগো থেকে পৃথক করা যায়। সাধারণত ট্রাডমার্ক একটি ছবি, বর্ন, অক্ষর অথবা প্রতীক হয়ে থাকে। যদি কোন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র সেবা প্রদান করে তাহলে ট্রেডমার্কের বদলে সার্ভিস মার্ক কথাটিও ব্যবহার করা যায়।

®ইংরেজি অক্ষর TM বা ট্রেডমার্ক হল অনিবন্ধিত ট্রেডমার্কের প্রতীক। এটি কোন পণ্য বা ব্র্যান্ডকে মানুষের সাথে পরিচিত করানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।

® ইংরেজি অক্ষর SM বা সার্ভিস মার্ক। এটিও কোন পণ্য বা ব্র্যান্ডকে মানুষের সাথে পরিচিত করানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।

® একটি বৃত্তের মাঝে R যার অর্থ হল এটি নিবন্ধিত ট্রেডমার্ক।

যেটি থাকতে পারে আপনার ব্রেন্ডিং প্যাকেজিং এর গায়ে, আপনার ক্যাশ মেমো বা চালানের গায়ে, আপনার দোকানের সাইনবোর্ড এর গায়ে কিংবা আপনার সকল ধরনের বিজ্ঞাপনের ব্যানারের গায়ে। পৃথিবীর সব দেশেই ব্যবসার প্রথম হাতিয়ার হিসেবে ট্রেডমার্ক কে প্রথম স্থানে নেওয়া হয়। বিশ্বের বড় বড় দেশে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা সহ আরও কিছু দেশে ট্রেডমার্কের ক্ষেত্রে “কমন ল” (Common Law) ব্যবহার করা হয়।

কেন ট্রেডমার্ক করা হয়

ধরুন আপনার একটি পণ্য আছে চিনি যার নাম “করিম চিনি” কিন্তু চট্রগ্রামে আরেকজনের চিনির ব্যবসা আছে তারও নাম “করিম চিনি” এখন আপনি করিম চিনি দিয়ে টিভি, রেডিও, পেপার সহ বিভিন্ন মাধ্যমে এ্যাড দিলেন। আপনার পণ্য অনেক প্রচার হয়েছে। করিম চিনিকে সবাই একনামে চিনে। কিন্তুু মার্কেট এর কাস্টমার যখন আপনার চিনি মনে করে চট্রগ্রামের ভাইয়ের “করিম চিনি” কিনে নিতে থাকবে ঠিক তখনেই আপনার মাথায় হাত পড়ে যাবে। তখন আপনি চট্রগ্রামের করিম চিনির উপর নালিশ করবেন বা আইনের আশ্রয়ে যাবেন। কিন্তুু এতে কোন কাজ হবে না। কারন আপনি তো “করিম চিনি” দিয়ে ট্রেডমার্ক করেন নি। তাহলে অবশ্যই আপনি চট্রগ্রামের “করিম চিনিকে” কোন আইনের আওতায় কাউকে নিয়ে আসতে পারবেন না বরং আপনি আইনের আওতায় চলে আসতে পারেন। আর যদি আপনার ট্রেডমার্ক করা থাকত অবশ্যই আপনি “করিম চিনিকে” কপিরাইট ব্রান্ড পাইরেসির আওতায় মামলা করতে পারবেন। তাই আপনাকে যে কোন ব্যবসা করতে হলে ট্রেডমার্ক করা অত্যান্ত জরুরী।

ট্রেডমার্ক না করলে কি হয়

ধরুন আপনি আপনার ব্যবসা খুব সুন্দর করে চালাচ্ছেন। আপনার পণ্য বা আপনার সেবা সাধারনের জন্য অনেক ভাল। তাই আপনার সেবার চাহিদা মার্কেট এ রয়েছে ব্যাপক কিন্তুু আপনি ট্রেডমার্ক করিয়ে নেন নি। তাহলে আমি যদি আপনার সেবা অনুযায়ী আপনার নাম অনুযায়ী একটি ব্রান্ডিং তৈরি করে আমি ট্রেডমার্ক করিয়ে বাজারজাত শুরু করি আর আপনি যদি বুঝতে পেরে আমাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসেন তাহলে কোন কাজ হবে না। আপনি হেরে যাবেন কারন আপনি আইনের বিরুদ্ধে ছিলেন। তাই আমি জয় করেছি। আপনার এতদিনের ব্যবসার সকল কিছু শূণ্য। বরং আমি আপনাকে কপিরাইট ব্রান্ডিং পাইরেসির আইনের মাধ্যমে সর্বচ্চো ৩ লক্ষ টাকা ও সর্বচ্চ ২ বছরের জেল হতে পারে।

Rebnal Tea

কিভাবে ট্রেডমার্ক আবেদন করবেন

বাংলাদেশের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রার বরাবরে পণ্যের ধরন অনুযায়ী নিবন্ধনের আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়া যাবে অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে www.dpdt.gov.bd আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আবেদন ফি জমা করতে হয়। কত ধরনের পণ্য বা সেবার জন্য নিবন্ধন চাওয়া হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে নিবন্ধন ফি কত হবে। তবে প্রথমেই পণ্য ও সেবার আন্তর্জাতিক শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী আপনার পণ্য কোন শ্রেণীভুক্ত তা আবেদনে লিখতে হবে। আন্তর্জাতিক নাইস (NICE) অ্যাগ্রিমেন্ট অনুযায়ী পণ্যের শ্রেণী জেনে নিতে হবে।

তারা যদি সব কিছু পরীক্ষা করে দেখে আপনার আবেদনের সব কিছু এবং লোগো এর সব কিছু ঠিক রয়েছে তাহলে আপনি ট্রেডমার্ক পাবেন এবং জার্নালে প্রকাশ পাওয়ার জন্য ফি জমা দিতে পারবেন। আর যদি আপনার লোগোতে কোন রকম ভুল পায় বা ম্যাচিং পায় তাহলে আপনার কারন দর্শানোর নোটিশ বা জবাবদিহিতা নোটিশ প্রদান করা হবে। আপনার জবাব সন্তোষজনক হলে আপনাকে জার্নালে প্রকাশের অনুমতি প্রদান করা হবে। আপনার জবাব অসন্তোষজনক হলে আপনার আবেদন বাতিল বলে ঘোষনা করা হবে। আপনি যদি সঠিক সময়ে আপনার জবাব প্রদান না করেন তাহলেও আপনার আদেবন বাতিল করতে পারবে।

আবেদনের বিরোধিতা হয়

উপরে দেখেছেন নিশ্চয়ই “করিম চিনির” গল্প। এখন দেখুন এর আইনি প্রক্রিয়া। আপনাকে যখন জার্নালে আপনার সেবা প্রচার করার অনুমতি দেওয়া হবে তখন আপনি জার্নালে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করবেন। ২ মাসের মধ্যে যদি কোন ব্যক্তি আপনার বিরুদ্ধে কপিরাইট পাইরেসি মামলা করে আর আপনার সব কিছু ঠিক না তাহলে আপনাকে আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আর যদি ফলাফল আপনার দিকে চলে যায় তাহলে মন্ত্রনালয় আপনার নিবন্ধন প্রদানের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহন করবে।

যেসব মার্ক নিবন্ধন করা যাবে না

কুৎসামূলক বা দৃষ্টিকটু মার্ক; বিদ্যমান কোনো আইনের পরিপন্থী মার্ক, প্রতারণামূলক বা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী মার্ক, সাদৃশ্যপূণ মার্ক, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত সৃষ্টি করতে পারে এমন মার্ক; কোন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা অফিসের নাম, মনোগ্রাম, মানচিত্র, পতাকা, জাতীয় প্রতীকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো মার্ক, রাসায়নিক পণ্য প্রভৃতি মার্কের জন্য আবেদন করা যাবে না।

ট্রেডমার্ক এর সময়কাল

ট্রেডমার্ক আবেদন করার পর থেকে প্রথমে আপনাকে ৭ বছরের জন্য দেওয়া হবে। তারপর আপনাকে ১০ বছরের জন্য দেওয়া হবে। প্রতি ১০ বছর পর পর আপনাকে রিনিউ করতে হবে।

আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

০১. মার্ক/লোগো/ডিভাইসের নাম, প্রতিরূপ অথবা বিবরণ

০২. আবেদনকারীর নাম।

০৩. আবেদনকারীর ঠিকানা ও জাতীয়তা।

০৪. আবেদনকারীর পদমর্যাদা (যেমন: মার্চেন্ডাইজার/কারখানার মালিক/সেবা প্রদানকারী/অন্যান্য)

০৫. মালামাল/সেবার সবিস্তার বিবরণী ও ধরণ

০৬. মার্ক ব্যবহারের তারিখ (তা বাংলাদেশে ব্যবহৃত হোক কিংবা ব্যবহারের জন্য প্রস্তাবিত হোক)

০৭. সাধারণ/নির্দিষ্ট মোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি), যা পরবর্তীতেও নথিভুক্ত করা যায়।

ট্রেডমার্ক আবেদন ফি কত

[ক্রমিক – পণ্যর পরিমান – আবেদন ফি – নবায়ন TM ফি]
(১) – ১ টি পণ্য – ১,৫০০ টাকা – ৫,০০০ টাকা
(২) – ২-৪ ট পণ্য – ২,৫০০ টাকা – ১০,০০০ টাকা
(৩) – ৪ এর অধিক পণ্য – ৩,৫০০ টাকা – ১৫,০০০ টাকা

কোথায় করবেন আবেদন

বিস্তারিত তথ্যের জন্য যোগাযোগের ঠিকানা:
রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড মার্কস অফিস
ডিপার্টমেন্ট অব পেটেন্ট, ডিজাইন এন্ড ট্রেড মার্কস
শিল্প মন্ত্রনালয় (৬ষ্ঠ তলা)
৯১ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা।
ও শাখা অফিসঃ চট্টগ্রাম শাখা অফিস ( কক্ষ নং-২১৮ হতে ২২১, সরকারি কার্য ভবন-১, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম)
ফোনঃ ৯৫৬০৬৯৬, ৩৫৫৬৭০৩, ৭১৬৯৮১৫,
ট্রেডমার্ক এর সরকারি ওয়েবসাইট
ফরমের লিংক: https://goo.gl/qCxhTe বা https://goo.gl/ADjt4M

তো ব্যবসায়ি ভাই ও বোনেরা আশাকরি আপনি আজকের গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি পড়ে বুঝতে পেরেছেন। অবশ্যই জানতে পেরেছেন ট্রেডমার্ক আসলে আমাদের ব্যবসার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আশাকরি সব কিছু বুঝেছেন। আর যদি আপনার কোন বিষয়ে জানার থাকে তাহলে কমেন্ট বক্স এ লিখে দিতে পারেন।

পোস্টটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Comment