বায়োফ্লক মাছ চাষের হিসাব সহ সব কিছু দেখে নিন

বায়োফ্লক মাছ চাষের দিকে বর্তমানে অনেক নতুন নতুন উদ্দ্যোক্তারা ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তুু তাদের জন্য সমস্যা হয় বায়োফ্লক মাছ চাষ করতে গেলে কি রকম টাকার দরকার। এই হিসেবটা অনেকেই মেলাতে পারে না। আবার একটি ফ্লক এ পানির পরিমান কতটুকু দরকার তারও হিসেব মিলাতে পারে না। এছাড়া বায়োফ্লক মাছ চাষ করার জন্য কোথোয় ট্রেইনিং নিতে হবে এগুলো চিন্তা করতেই মাথা ঘুরে যায়। আজ আমি নতুন উদ্দ্যোক্তাদের জন্য সব কিছু বিস্তারিত লিখব। যাতে করে যারা বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করতে চান তাদের একটি সঠিক ধারনা ও মাছ চাষের হিসাবের আইডিয়া তুলে ধরব।

বায়োফ্লক কি?

বায়োফ্লক হলো খুব অল্প জায়গায় ফ্লাক তৈরি করে বেশি মাছ উৎপাদনের একটি উদ্দ্যোক্তা প্রকল্প। এটি সমপূর্ণ নতুন পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে ভাল আয় করা যায়।

বায়োফ্লক মাছ চাষের হিসাব

এখাদে উদাহরন সহ বায়োফ্লক মাছ চাষের হিসাব দেওয়া হয়েছে। আপনি এই হিসাবের সাথে বাস্তবতার থেকে কিছু মিল-অমিল পেতে পারেন। তবে আপনাকে এখানে শিং মাছ চাষ করার হিসেব করে দেখানো হল। আর আমরা হিসেব করব ১০ টি ফ্লাক তৈরি করে শিং মাছ চাষের হিসেব।

বায়োফ্লক খরচ

আপনি যখন একটি প্রজেক্ট চালাতে শুরু করবেন তখন অবশ্যই আপনাকে প্রথমে ইনভেস্ট করতে হবে। সেই ক্যাটাগরির বায়োফ্লক মাছ চাষ করার জন্য আপনাকে অনেক কাজ করতে হবে। তারজন্য খরচ হবে একটু। আসুন সব খরচের হিসেব ক্যালকুলেশন করি।
• ১০ টি ট্যাংক নির্মানের জন্য খরচ হবে ৪ লক্ষ টাকা।
• ১০ টি শেড নির্মানের জন্য খরচ হবে ৩ লক্ষ টাকা।
• অন্য খরচ যেমনঃ ইলেক্টিক, নলকূপ, মটরপাম্প, সিসি ক্যামেরা, লেবার বিল, ইট,বালু, পাথর, রড ইত্যাটি ইত্যাটি মিলিয়ে খরচ ধরলাম ১ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা।
তাহলে উপরের ১০ টি ফ্লক তৈরিতে আমাদের মোট খরচ = ৪+৩+১.৫০ = ৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মাত্র।

উৎপাদন খরচ

আপনি ১০ টি ফ্লক ট্যাংক তৈরি করার জন্য আপনার খরচ হয়েছে ৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এবার আপনি ১০ টি ট্যাংক এ শিং মাছ ছাড়ুন এবং তা ১ বছর লালন পালন করুন। তারজন্য আবার আপনাকে খরচ করতে হবে এই রকম

• শিং মাছের পোনা ২ লক্ষ ২০ হাজার টাকা।
• ১ জন কর্মচারীর বেতন ১০ হাজার টাকা হলে ২ জন কর্মচারির বেতন হবে ২০০০০/- হাজার টাকা। তা সারাবছরে ২ জন কর্মচারিকে দিতে হবে ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা।
• বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য বিল একটা এভারেজ এ ধরে নেই ৮০ হাজার টাকা।
• মাছের খাদ্যের জন্য ধরে নেই ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা।
• মাছের প্রোবায়োটিক ২৫ হাজার টাকা।

তাহলে এক বছরে ১০ টি ফ্লকে মাছ চাষ করতে ব্যায় হবে যথাক্রমে – ২,২০০০০ + ২,৪০০০০ + ৮০,০০০ + ৪,৫০০০০ + ২৫,০০০০/- = ১০ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা মাত্র।

তাহলে আপনার বায়োফ্লক মাছ চাষের ট্যাংক তৈরি ও ১ বছরে মাছ চাষ করতে সর্বমোট ব্যায় হয়েছে:
• বায়োফ্লক ট্যাং তৈরিতে : ৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা।
• বছরে মাছ চাষে ব্যয়: ১০ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা।
সর্বমোট ১ বছরে ব্যয় = ১৮ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা।

বছরে মাছ বিক্রি

আপনি এবার ১ বছর পর ১০ টি বায়োফ্লক ট্যাংক থেকে শিং মাছ বিক্রি করবেন। নরমালি একটি ট্যাং থেকে আপনার শিং মাছ উৎপাদন হবে
• ১ টি ট্যাং থেকে উৎপাদন ৩৫০ কেজি।
• ১০ টি ট্যাং থেকে উৎপাদন ৩৫০x১০ = ৩,৫০০ কেজি শিং মাছ।
তাহলে আপনার ১০ টি ট্যাং থেকে সর্বনিম্ন বায়োফ্লক থেকে শিং মাছ উৎপাদন ৩ হাজার ৫০০ কেজি / ৩.৫ টন।

কত করে মাছ বিক্রি হবে

বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিং মাছের দাম নির্ধারন করে। আমরা এখানে সর্বনিম্ন বা সর্বচ্চো হিসেবে ধরব না। স্থিতিশীল হিসেবে আপনি প্রতিকেজি মাছ বিক্রি করতে পারবেন ৩০০ টাকা করে।

Rebnal Tea

• প্রতিকেজি ৩০০ টাকা হলে ১ টি ট্যাংক হতে উৎপাদন ৩৫০X৩০০= ১০৫,০০০ /- টাকা
• ১০ টি ট্যাং এর মাছের দাম হয় : ৩,৫০০X ৩০০= ১৮,৯০০০০/- টাকা মাত্র।

এখন আয় ও ব্যায় হিসেব করা যাক

আপনি এক বছরে সব রকম খরচ দিয়ে ব্যায় করেছেন ১৮ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা, আর ১ বছর পর মাছ বিক্রি করেছেন ১৮ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা।তাহলে আপনার হিসেব হয়
• ১ বছরে ব্যায় ১৮ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা।
• ১ বছরে বিক্রি ১৮ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা।
তাহলে ১৮,৬৫০০০ – ১৮,৯০০০০ = ২৫,০০০০/- মোট বছরে আয় ২৫ হাজার টাকা মাত্র।

এখানে মন খারাপের কিছু নেই, আপনি প্রথম বছরে তেমন আয় করতে পারবেন না। কারন আপনার বায়োফ্লক ট্যাংক তৈরি করতে খরচ হয়েছে। কিন্তুু ২ বছর থেকে আপনাকে পানির ট্যাং তৈরি করতে খরচ করতে হবে না। তাহলে ২ বছরের একটা ঝাটকা ছাক্কা হিসেব হয়ে যাক।

• ১ বছরে মাছ চাষে ব্যয় : ১০ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা।
• ১ বছরে মাছ বিক্রি হবে : ১৮ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা।
তাহলে ব্যয় ও আয় হিসেব করলে অঙ্ক চলে আসে : ১০,১৫,০০০ – ১৮,৯০,০০০ = ৮,৭৫০০০০/- টাকা মাত্র। তাহলে আপনার ২ বছরে সব খরচ বাদ দিয়ে আয় হল ৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা।

বিঃদ্রঃ – এই হিসেবটি আমরা মৌখিক করে হিসেব করেছি। আপনার হিসেবের সাথে নাও মিলতে পারে। তবে এই হিসেবটা সব কিছুর কাছাকাছি হবে। আর অবশ্যই শিং মাছ হতে হবে। আপনি মাগুর মাছ চাষ করলে আলাদা হবে বা অন্য কোন মাছ চাষ করলেও হিসেব ভিন্ন রকম হবে।

বায়োফ্লক মাছ চাষের পানির হিসেব

আপনি বায়োফ্লক মাছ চাষ করতে চাইলে পানির হিসেব আপনাকে যানতে হবে। এর জন্য প্যারামিটার সহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি লাগবে তার কিছু দেওয়া হল:

• পিএইস মিটার।
• টিডিএস মিটার ।
• এ্যামোনিয়া টেস্ট কীট।

পিএস মিটারের কাজ কি?

পাফারফ অফ জহাইড্রজেন অথ্যাৎ পানিতে হাউড্রোজেন ও অক্সিজেন এর সমন্ময়ে পানি মাপার যন্ত্র এই পানির পিএইস ৬.৫ থেকে ৯ থাকা উচিৎ।

টিডিএস মিটারের কাজ কি?

টিডিএস এর কাজ হলো আপনার বায়োফ্লক ট্যাংক এর পানি বর্তমানে মিঠা পানি, আর মিঠা পানিকে লবনাক্ত পানিতে রুপান্তরিত করার মাধ্যম। টিডিএস ১৫০০ মিলি: থেকে ১৮০০ মিলি: থাকা উচিৎ। আপনি আস্তে আস্তে এই মাত্রা বাড়িয়ে দিবেন। প্রথমে ৫০০ মিলি: থেকে ৬০০ মিলি: দিয়ে শুরু করবেন। ১৮০০ মিলি: এর উপরে কখনও যাবেন না।

এ্যামোনিয়া টেস্ট কীটের কাজ কি?

এ্যামোনিয়া এর কাজ হল ফ্রেস ওয়াটার ও স্বল্ভ ওয়াটার পরিমাপ করার যন্ত্র। এই যন্ত্রের ব্যবহার ও বিস্তারিত জানতে পারবেন আপনি যেখানে ট্রেইনিং করবেন। এই হিসেবটা একটু জটিল বলে লেখে বুঝানোর চেষ্টা করলাম না।

বায়োফ্লক এর পানির তাপমাত্রা অবশ্যই ২৮ থেকে ৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস থাকতে হবে । এ বিষয়গুলো আপনি হাতে কলমে শিখলে ও ট্রেইনিং নিলে আপনার জন্য ভাল হবে। এছাড়া ডিও মিটারের কাজ কি সহ বিভিন্ন কিছু জানতে পারবেন।

বায়োফ্লক মাছ চাষের ট্রেইনিং

আপনি বায়োফ্লক মাছ চাষ সহ যে কোন ধরনের মাছ চাষের জন্য সরকারিভাবে ট্রেইনিং নিতে পারেন। এছাড়া অনেক এনজিও প্রাইভেট বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান থেকেও ট্রেইনিং নিতে পারেন। আমাকে যদি প্রশ্ন করেন যে কোথা থেকে ট্রেইনিং নিবো? আমি সরাসরি উত্তর দিবো আপনি সরকারি ভাবে বায়োফ্লক মাছ চাষের জন্য ট্রেইনিং নিবেন। কারন একদিকে যেমন বায়োফ্লক মাছ চাষ করার সকল ট্রেইনিং পেলেন অপরদিকে উদ্দ্যোক্তা হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে আপনাকে আর্থিক সহ বিভিন্নরকম সাহায্য ও সহযোগীতা পাবেন। আপনি মৎস গবেষনা সদরদপ্তর, ময়মনসিংহ -২২০১ থেকে ট্রেইনিং এর বিস্তারিত সকল তথ্য জানতে পারবেন।

পোস্টটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Comment