বায়োফ্লক মাছ চাষের লাভজনক ব্যবসা

মাছের ব্যবসা একটি লাভজনক ব্যবসা। সেটা যদি আপনি সঠিক ভাবে এবং সঠিক নিয়ম অনুসারে করেন তাহলে ভাল। বায়োফ্লক মাছ চাষ তেমনি একটি নতুন পদ্ধতির মাছের ব্যবসা। কম টাকায় কম সময়ে ও কম জায়গায় এই বায়োফ্লক ব্যবসাটি দিন দিন সবার মাঝে গুরত্ব বাড়ছে। আর মাছে ভাতে বাঙালী কথাটার মানেই হলো আমরা মাছ ভাত কতটা ভালবাসি ও মাছের গুরত্ব আমাদের বাঙালীদের মাঝে কেমন। আজকে আমি আপনাদের এই বায়োফ্লক মাছ চাষের পদ্ধতি, আইডিয়া, ট্রেইনিং এর নিয়ম সহ সব ধরনের আইডিয়া আপনাদের কাছে তুলে ধরব। আশাকরি পুরো পোস্ট পড়বেন এবং আপনার মন্তব্য করবেন। উত্তর দিবো ইনশাআল্লাহ্। চলুন এবার বায়োফ্লক ব্যবসা সমন্ধে বিস্তারিত জেনে নেই।

বায়োফ্লক কি?

বায়োফ্লক হলো এমন একটি মাছ চাষের পদ্ধতি। যেটি খুবেই অল্প স্থানে অল্প পানিতে বেশি মাছ চাষ করা যায়। মোট কথা হলো পানি ব্যবস্থাপনা ও ফ্লক এর দুটির সমন্বয়ে হলো বায়োফ্লক। আর বায়োফ্লক এ কখনও মাছ ব্যতীত অন্য কিছু চাষ করা যায় না।

 

বায়োফ্লকে মাছ চাষ করতে গেলে কি কি করা দরকার

 

বায়োফ্লক কি সেটা উপরে জানতে পেরেছেন। এবার শুরু করব কিভাবে করবেন এবং কি কি দরকার। প্রথমে আপনাকে একটি দরকার হবে ট্যাংক আর এই ট্যাংক কিভাবে নির্মান করবেন সেটি এবার বুঝানো হবে। প্রথমে এ গ্রেড রড দিয়ে পানির ট্যাংক এর বৃত্তাকার ( গোল) তৈরি করে ফেলুন। সেটি সর্বনিম্ন ৬ ফুট ব্যসার্ধ ও ৪ ফুট উচ্চতায় করে ফেলুন। এবার সহজেই সিসি ঢালাই করে নিন। আপনি যে বৃত্তাকার ট্যাংটি তৈরি করেছেন ঠিক তার মাঝখানে পানি ঢুকার জন্য পাইপ বসিয়ে দিন। যাতে সমানভাবে ট্যাংক এ পানি ঢুকতে পারে ও বের করে দিতে চাইলে বের হতে পারে। এর পর ঢালাই দিয়ে দিন। ২ থেকে ৩ দিন রাখুন ঢালাই অবস্থায়। যখন মেঝে শক্ত হবে তখন আপনি ঢালাইয়ের উপর থেকে শুরু করে ওয়াল পর্যন্ত পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিন। পলিথিন এমনভাবে দিবেন যেন পলিথিন থেকে পানি বের না হয়ে যায়।

এটেরটর পাম্প লাগানঃ আপনার কষ্টের সেই বায়োফ্লক ট্যাংটিতে যেটি সব সময় অক্সিজেন সরবরাহ করবে সেটিই হলো এটেরটর পাম্প। যা আপনাকে বায়োফ্লক ট্যাংটিতে স্থাপন করতে হবে । যেটি সার্বক্ষণিক ট্যাংক এ অক্সিজেন সাপ্লাই করবে। এ পর্যন্ত আপনার বায়োফ্লকে মাছ চাষের চিন্তাধারা সহ পানির ট্যাংক তৈরি করা হল। এবার পানি ভরিয়ে দেওয়ার পালা।

পানি তৈরিঃ প্রথমে আপনাকে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পানির ট্যাংটি সুন্দর করে পরিস্কার করতে হবে। পরিস্কার করার সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করেবেন। যেন আপনার দেওয়া পলিথিনটি ছিঁড়ে ফেটে অথবা কেটে না যায়। আর বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষে পানির গুণাবলী অবশ্যই থাকতে হবে। পানি সংগ্রহ করুন গভীর নলকূপ, সমুদ্র, নদী, বড় জলাশয়, লেক ও বৃষ্টির পানি। তবে যেখান থেকেই ট্যাংকের জন্য পানি সংগ্রহ করুন না কেন সেই পানি যেন অবশ্যই গুণ ও মান ভাল হয় নিম্নে তা আপনাদের বুঝানোর জন্য পর্যায়ক্রমে দেওয়া হলোঃ

১. তাপমাত্রা – ২৫ – ৩০ ° C

২. পানির রং – সবুজ, হালকা সবুজ, বাদামী।

৩. দ্রবীভূত অক্সিজেন – ৭- ৮ mg/L

৪. পিএইচ – ৭.৫ – ৮.৫

৫. ক্ষারত্ব – ৫০ – ১২০ mg/L

৬. খরতা – ৬০ – ১৫০ mg/ L

৭. ক্যালসিয়াম – ৪ – ১৬০ mg/L

৮. অ্যামোনিয়া – ০.০১ mg/L

৯. নাইট্রাইট – ০.১ – ০.২ mg/L

১০. নাইট্রেট – ০ – ৩ mg/L

১১. ফসফরাস – ০.১ – ৩ mg/L১২. H2S – ০.০১ mg/ L

১৩. আয়রন – ০.১ – ০.২ mg/L

১৪. পানির স্বচ্ছতা – ২৫ – ৩৫ সে.মি.

১৫. পানির গভীরতা – ৩ – ৪ ফুট

১৬. ফলকের ঘনত্ব – ৩০০ গ্রাম / টন

১৭.TDS – ১৪০০০ – ১৮০০০ mg/L

১৮. লবণাক্ততা – ৩ – ৫ পিপিটি

ট্যাংক বানানো হলো, ঢালাই করা হলো, পরিমানমত পানি দেওয়া হলো__এবার আর একটি কাজ করতে হবে। সেটি হলো পানিতে ফ্লক তৈরি করতে হবে। আর ফ্লক তৈরি করতে গেলে আপনাকে এই সব কিছু পানিতে দিতে হবে। তার পর আপনি ফ্লক তৈরি করার জন্য প্রস্তুত হবেন। পর্যায়ক্রমে ফ্লক তৈরির উপাদানগুলো দেওয়া হলো।

০১. প্রথম ডোজে ৫ পিপিএম প্রোবায়োটিক।
০২. ৫০ পিপিএম চিটা গুড়।
০৩. ৫ পিপিএম ইস্ট।
০৪. অক্সিজেন।
পানি প্রতি টনের জন্য ১ লিটার অক্সিজেন বালটিতে সংগ্রহ করবেন এবং ৮ ঘন্টা থেকে ১০ ঘন্টা কালচার করে প্রয়োগ করবেন। এর পর ২য় দিন থেকে এক পিপিএম প্রোবায়োটিক ৫ পিপিএম চিটাগুড় ও প্রতি টনের জন্য এক লিটার পানি দিয়ে উপরের সময় অনুযায়ী ও নিয়মের কালচার করে প্রতিদিন ট্যাংক এ প্রয়োগ করুন। ব্যস এবার আপনার বায়োফ্লক প্রজেক্ট একদমেই রেডি।

পানি ও ট্যাংক পর্যবেক্ষন

এবার দেখুন আপনার বায়োফ্লক মাছ চাষের প্লানটি কি সঠিক হয়েছে কিনা এবং কি কি বিষয় পানিতে দেখতে পাবেন।

০১. ট্যাংকের পানির রং সবুজ ও বাদামি দেখাবে।
০২. পানিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দেখতে পাবেন।
০৩. পানি পরিক্ষা করলে এ্যামোনিয়া মুক্ত থাকবে।
০৪. প্রতিলিটার পানিতে ০.৩ গ্রাম ফ্লকের ঘনত্ব পাবেন।
০৫. ছোট কচুরি পানা ( ক্ষুদিপানা) দেওয়ার পর তার বংশ বিস্তার হতে শুরি করবে।

উপরক্ত বিষয়গুলো যদি ঠিক থাকে তাহলে বুঝবেন আপনার বায়োফ্লক মাছ চাষের ট্যাংক একদম পুরোপুরি মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত। আর যদি এসবের কোন একটি বাদ থাকে তাহলে ২ থেকে ৩ দিন অপেক্ষা করুন। তার পরেও যদি ঠিক না হয় তাহলে আপনি সব কিছু যথাযথ চেক করে নিন।

সব কিছুই হয়ে গেল এবার মাঝ চাষের পালাঃ

আমরা শিং মাছ নিয়ে আলোচনা করব। আলোচনা করতেছি যেহেতু শিং মাছ নিয়ে আবার মনে করবেন না যে বায়োফ্লক এ শুধু শিং মাছেই চাষ করা হয়। আসলে তা নয় আপনি শিং, মাগুর,ট্যাংরা, চিংড়ি, কৈ, রুই কাতলা সহ সব রকমের মাছ চাষ করতে পারবেন।

আপনি ৬ ফুট ব্যাসার্ধে ও চা ফুট উচ্চতায় ১৪০০ টি শিং মাছ চাষ করতে পারবেন। যাহা ৭০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত হবে। দেশি শিং মাছগুলোর প্রতিকেজি সর্বনিম্ন ২৬০/- টাকা করে হলে গড় মূল্য কত হয় সেটি আপনি হিসাব করে নিন। এই রকমভাবে একটি বায়োফ্লক ট্যাংক এ বছরে তিনবার মাছ চাষ করা যাবে। যদি বছরে ৩ বার চাষ করে প্রতিচালানে ৭০ কেজি হয়। তাহলে ৩x৭০= ২১০ কেজি। এখন যদি ২১০x ২৬০= ৫৪৬০০/- বছরে আয় হবে। তাহলে একজন উদ্যোক্তার যদি ৩ টি বায়োফ্লক পানির ট্যাংক থাকে তাহলে অবশ্যই সেই উদ্যোক্তা বছরে লক্ষপতি। আপাতত লক্ষপতি হওয়া বড় কথা নয় বড় কথা হচ্ছে বেকার নামের কথাটা মুছে ফেলা।

কোথায় করবেন বায়োফ্লক এর ট্রেইনিং

 

দেশে বেকারত্ব ঠেকাতে বেশ নজর দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে কৃষি ও মৎস এর উপর বেশি নজর দিচ্ছে। আপনি যদি বায়োফ্লক মাছ চাষের জন্য সরকারিভাবে ট্রেইনিং নিতে চান তাহলে যোগাযোগ করতে পারেন আপনার জেলা শহরের কারিগরি শিক্ষা ইন্সটিউট অথবা আপনি আপনার জেলা উপজেলা পর্যায়ের মৎস অধিদপ্তরের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মৎস কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করুন ওনারাই আপনাকে বাকিটা ব্যবস্থা করবে। সত্য কথা বলতে সরকারিভাবে ট্রেইনিং নিলে সরকার থেকে অনেক সহযোগীতা পাওয়া যায়। আপনি একজন উদ্দ্যোক্তা তাহলে অবশ্যই আপনার সেই অধিকারগুলো আপনাকে সরকারের কাছ থেকে নিতে হবে। এটা সব ব্যবসায়িক ও তরুন উদ্যোক্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

উপরক্ত বিষয়গুলো আপনি সঠিকভাবে পালন করলে লাভবান হবেন। কারন বায়োফ্লক এ তেমন ঝুকি নেই। জায়গা কম লাগে। মাছ চুরি হওয়ার তেমন ভয় নেই। টাকাও লাগে কম। যখন সব কিছুই কম কম আর লাভের পরিমান বেশি তাহলে অবশ্যই আমি মনে করি মাছ ব্যবসার জন্য ভাল ব্যবসাটি হলো এই নতুন প্রজন্মের বায়োফ্লক মাছ চাষের ব্যবসা। আপনি প্রথমে শাহস করে শুরু করুন একদমেই লাভের মুখ দেখতে পাবেন। আর হ্যা বায়োফ্লক এর মাছ চাষ নিয়ে আরও লিখব আপনাদের জন্য।

পোস্টটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন

3 thoughts on “বায়োফ্লক মাছ চাষের লাভজনক ব্যবসা”

  1. খুব ভাল লাগলো আপনার পোস্ট।

    আমি বায়োফ্লক মাছ চাষ করতে চাই। কিন্তু আমি এ বিসয়ে অনভিজ্ঞ।

    কিভাবে পানি পরিক্ষা করব কোন
    সময় কি করব এ বিসয়ে আমার ট্রেনিং দরকার।

    তাছাড়া আমার ক্যাস কম।

    তাই আমাকে যদি এই বিসয়গুলি ক্লিয়ার করেন ধন্য হব।

    Reply
    • জাহিদ ভাই, আপনাকে বিগেনিংহাব ব্লগ এ স্বাগতম। ট্রেইনিং এর বিষয়টি সেখানে দেওয়া আছে। আমি কিছুদের মধ্যে বায়োফ্লক মাছ চাষের হিসাব ও পানি নিয়ে লিখব ইনশাআল্লাহ্। আশাকরি ট্রেইনিং সহ সব তথ্য পাবেন সেই লেখাটিতে। 🙂

      Reply

Leave a Comment